27.5 C
Chittagong
সোমবার, ২০ মে ২০২৪
প্রচ্ছদজাতীয়বাংলাদেশ পুলিশের অনন্য এক নক্ষত্রের নাম মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম 

বাংলাদেশ পুলিশের অনন্য এক নক্ষত্রের নাম মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম 

  জালালউদ্দিন সাগর

অনন্য এক নক্ষত্রের নাম মো. শফিকুল ইসলাম। মেধা,দক্ষতা, সৎ ও পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে ঈর্ষণীয় এই মানুষটি ৩৩ বছরের পেশাগত জীবনের সমাপ্তি টানছেন আজ। যাচ্ছেন অবসরে। মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম মানেই বাংলাদেশ পুলিশে পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তার উজ্জ্বল এবং অনন্য উদাহরণ।

আজ ২৯ অক্টোবর,শনিবার বিকালে ৩৩ বছর পেশাগত জীবন শেষে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী থেকে অবসরে গেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন (ডিএমপি) পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম। বিদায় নিয়েছেন ডিএমপি থেকেও।

অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার হিসেবে সদ্য পদায়ন হওয়া খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, সৎ এবং চৌকস কর্মকর্তা হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে শফিক স্যারের গ্রহণ যোগ্যতা একক এবং অনন্য। বাংলাদেশ পুলিশের অনন্য এক নক্ষত্রের নাম মো.শফিকুল ইসলাম স্যার।

খন্দকার গোলাম ফারুক আরও বলেন, আমার সৌভাগ্য শফিক স্যারের মতো একজন গুণী অফিসারের হাত থেকে আমি দায়িত্ব নিয়েছি।

২০১৯ সালের ১৮ অক্টোবর অতিরক্ত আইজিপি হিসেবে পদোন্নতি পান শফিকুল ইসলাম। এর  পর দায়িত্ব পালন করেন এন্টি টেরোরিজম ,অতিরিক্ত আইজিপি এইচআরএম। দায়িত্ব পালন করেছেন সিআইডিতেও।  সর্বশেষ ৩৪তম কমিশনার হিসেবে গত ২০১৯ সালে ডিএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। তারও অিাগে চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআেইজি এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়ীত্বপালন করেছিলেন বাংলাদেশ পুলিশের অনন্য মেধাবী এই কর্মকর্তা।

ডিএমপিতে তিন বছরেরো অধিক সময় দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ডিএমপি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুলিশে দীর্ঘ চাকরি জীবনে কোনো সমস্য নিয়ে আমার দরজায় কেউে এসেছেন তিনি খালি হাতে ফিরে যান নি। যেতে দেইনি।

দীর্ঘ চাকরি জীবনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে ডিএমপির বিদায়ী কমিশনার মো.শফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে একটি মাত্র পেশা যে পেশার মানুষ ঘুম থেকে ওঠে মানুষের কথা ভাবে। আবার ঘুমোতে যাবার আগেও ধ্যানজ্ঞানে থাকে শুধুই মানুষ-সে পেশাটি হলো ‘বাংলাদেশ পুলিশ’। নিজের বাবা-মা,ভাই-বোন,স্ত্রী-সন্তানদের কথা ভাবার আগে যে পেশার মানুষ শুধুই মানুষের কথা ভাবে,মানুষের নিরাপত্তার কথা ভাবে তারাই পুলিশ। কিন্তু সে আমরাই ঘুম থেকে ওঠে একবার পুলিশকে মন্দ বলি,গালি দিই। আবার ঘুমোতে যাওয়া আগেও দেই। তবুও সে পুলিশই অন্ধকারে নিরাপত্তার ঢাল হয়ে দাঁড়ায় আপনার পাশে’-বলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বিপিএম(বার)।

তিনি আরও বলেন, আপনি যখন অপরাধজনিত কোনো সমস্যায় পড়বেন দেখবেন আপনার আশে পাশে লোকজন কমতে শুরু করেছে। খুব কাছের বন্ধুটিও তখন অনেক দূরে চলে যায়। অনেকে আবার একধাপ এগিয়ে আপনার বিরোদ্ধে অপরাধ প্রমান হওয়ার আগেই অপরাধী বানিয়ে দেবে আপনাকে-এই যখন আপনার অবস্থা তখনও কিন্তু আপনার পাশে থাকে পুলিশ। যতক্ষণ আপনি অপরাধী প্রমাণিত হবেন না ঠিক ততক্ষণ পুলিশ নিরাপত্তার ঢাল হয়ে পাশে থাকে আপনার। একজন মানুষ যতক্ষণ অপরাধী প্রমাণিত হবেন না ততক্ষণ তাঁর পাশে থাকি আমরা। বলেন শফিকুল ইসলাম।

তিনি আরও বলেন, ইদ-পার্বণে আপনি আপনার আত্মীয়স্বজনের সাথে আনন্দে সময় কাটাতে গ্রামে যান আর আপনার বাসা,অফিস পাহারা দেই আমরা। একবারও কী কেউ ভেবেছেন কত শত পুলিশ সদস্য আছে যাঁরা এই সুযোগটুকু পায় না। সারা দিন রোজা রেখে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আধপেটে ইফতার করে পুলিশ। তবুও নিরবচ্ছিন্ন ভাবে নিশ্চিত করে আপনি যেন বাসায় গিয়ে ইফতার করতে পারেন।

সেবকের ধ্যান-ধারণা,মানসিকতা নিয়ে বর্তমানে যে পুলিশ জনগণের জন্য কাজ করছে সে পুলিশের সাথে ব্রিটিশ পুলিশের কোনো মিল নেই। তবুও আমরা পুলিশকে বন্ধু ভাবতে পারি না! কিন্তু কেন। প্রশ্ন রাখেন শফিকুল ইসলাম।

মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম। আলমডাঙার নওদাবন্ড বিল গ্রামের অজ পাড়া গাঁ থেকে মেধা আর যোগ্যতাকে ঢাল করে জায়গা করেনিয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের ঈর্ষণীয় আসনে। বর্তমানে পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ এ। সৎ, মেধাবী আর পরিচ্ছন্ন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নিজ পেশাতেও ঈর্ষণীয় শফিকুল ইসলাম।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দপ্তরে নিজ কার্যালয়ে বসে এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় পুলিশের এই উর্ধ্বতন কর্মকর্তার। আলাপচারিতায় উপরের মন্তব্যগুলো করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন,ভালো খারাপ নিয়েই প্রকৃতি এবং পৃথিবী। পুলিশের মধ্যে সবাই ভালো বা মানববান্ধব তা বলবো না। কিন্তু জোর দিয়ে বলতে পারি বাংলাদেশ পুলিশের অধিকাংশ পুলিশ সদস্য মানবতার সেবক। যাঁরা শুধুই মানুষের কথা ভাবেন।

শফিকুল ইসলাম চাকরি জীবনে বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজের যোগ্যতাকে প্রমাণ করেছেন সাহসী পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে। এর মধ্যে তিনি খাগড়াছড়িতে সহকারী পুলিশ সুপার দায়িত্ব পালন করেন (১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯২)। এএসপি,সদর সার্কেল, মৌলভীবাজার (২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯৪), সহকারী পুলিশ কমিশনার, সিএমপি (১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫ থেকে ২২ জুলাই ১৯৯৫),অতিরিক্ত পুলিশ সুপার,খাগড়াছড়ি (২৪ জুলাই ১৯৯৫ থেকে ২০ এপ্রিল ১৯৯৬), অতিরিক্ত পুলিশ সুপার,কুমিল্লা (১৭ মার্চ ১৯৯৭ থেকে ১৬ মে ১৯৯৯), অতিরিক্ত উপ কমিশনার, ডিএমপি (২৭ মে ১৯৯৯ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০০০), পুলিশ সুপার, সৈয়দপুর রেলওয়ে পুলিশ (১৫ আগস্ট ২০০১ থেকে ১ ডিসেম্বর ২০০১), পুলিশ সুপার, নারায়ণগঞ্জ (৩ ডিসেম্বর ২০০১ থেকে ৬ নভেম্বর ২০০২),অধিনায়ক, ১০ম এপিবিএন, সিলেট (১ জানুয়ারি ২০০৩ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর ২০০৪), পুলিশ সুপার, পটুয়াখালী (১৯ সেপ্টেম্বর ২০০৪ থেকে ১৯ নভেম্বর ২০০৬), পরিচালক (প্রশাসন), পুলিশ স্টাফ কলেজ (২৮ নভেম্বর ২০০৬ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০০৭), অধিনায়ক এপিবিএন, চট্টগ্রাম (২২ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ থেকে ৯ আগস্ট ২০০৭), পুলিশ সুপার, সুনামগঞ্জ (১৪ আগস্ট ২০০৭ থেকে ২৯ মার্চ ২০০৯), পুলিশ সুপার, কুমিল্লা (৩০ মার্চ ২০০৯ থেকে ১২ জানুয়ারি ২০১১), অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, সিএমপি (১৫ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০১১), পুলিশ কমিশনার , সিএমপি (১ জানুয়ারি ২০১২ থেকে ২৭ আগস্ট ২০১৪), ডিআইজি, চট্টগ্রাম রেঞ্জ (২৭ আগস্ট ২০১৪ থেকে ৬ এপ্রিল ২০১৭), অ্যাডিশনাল আইজি এন্টি টেররিজম হেডকোয়ার্টার্স (৭ ডিসেম্বর ২০১৭ থেকে ১৮ নভেম্বর ২০১৮),অ্যাডিশনাল আইজি (এইচআরএম), পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, (২০ নভেম্বর ২০১৮থেকে ১৯ মে ২০১৯), অ্যাডিশনাল আইজি, সিআইডি, (১৯ মে ২০১৯ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯), গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ থেকে ২৯ অক্টোবর ২০২৩ সাল পর্যন্ত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হিসাবে দায়িত্ব পাালন করেছেন তিনি।

মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ১৯৬২ সালের ৩০ অক্টোবর চুয়াডাঙা জেলার আলমডাঙা থানার নওদাব- বিল গ্রামে এক সভ্রান্ত পরিবাওে জন্মগ্রণন করেন। আলমডাঙা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৮ সালে এসএসসি এবং আলমডাঙা কলেজ থেকে ১৯৮০ সালে এইচএসসিপাশ করেন তিনি। এরপর ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি সম্মান ডিগ্রি অর্জন করেন।

পরিবারের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, বাবা মো.শওকত আলী ছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী । মা সুফিয়া খাতুন গৃহিণী। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে আমিই বড়। মেজো ভাই তোফায়েল আহমেদ বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্বিবিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। তিনি আরও বলেন, বিবাহিত জীবনে আমি দুই কন্যা সন্তানের জনক। বড় মেয়ে সুরাইয়া শেমন্তী ইসলাম পড়ালেখা করছেন ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়ে আর ছোট মেয়ে সাবিহা শ্রাবন্তী ইসলাম দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। স্ত্রী,খাদিজা তুল কোবরা,গৃহিণী।

অসম্ভব শান্ত,অমায়িক একজন মানুষ শফিকুল ইসলাম। কথা বলেন মেপে মেপে। না বলতে পারেলেই হয়তো বেঁচে যান। তবুও এই কথা কম বলা মানুষটির মিষ্ট আতিথেয়তায় মুগ্ধ হন নি এমন মানুষ পাওয়া দুস্কর। কথা কম বলেন বলেই হয়তো বিচক্ষণতার তীক্ষ্ণতা অনেক বেশি। অত্যন্ত জটিল পরিবেশেও নিজেকে শান্ত রেখে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার ‘যাদুরকাঠি’ রাখেন সাথে।

অদৃশ্য সেই যাদুরকাঠির রহস্য কী জানতে চাইলে হাসেন তিনি। বলেন, প্রত্যেক মানুষ আলাদা, আলাদা তাঁর কাজ করার কৌশলও। হয়তো সে কৌশলগত দক্ষতার কারনেই শফিকুল ইসলাম বাংলাদেশ পুলিশের সর্বোচ্চ পদক বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল (বিপিএম) পেয়েছেন তিনবার। নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুলিশের এই চৌকস কর্মকর্তা নানামুখি কাজ করেছেন পুলিশ পরিবারের জন্যও। সে কারণে পুলিশ বাহিনীতেও অত্যন্ত জনপ্রিয় তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের এই লড়াকু সৈনিক মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, পড়ন্ত বিকেলে খাকি পোশাকের একদল মানুষ ঢুকে পড়ে আমাদের গ্রামে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই যেখানে যাকে পেয়েছে ধরে এনে খালের পাড়ে পিছমোড়া করে বেঁধে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। চারদিকে হৈচৈ আর্তচিৎকার! বাঁচাও বাঁচাও! সেদিন পাকহানাদার বাহিনী এক কাতারে কত জনকে গুলি চালিয়েছিল বলতে না পারলেও নয় বছরের এই আমি সেদিনই ঠিকই বুঝেছিলাম-হানাদার বাহিনীর তা-বে রক্তলাল হয়েছিল আলমডাঙার নওদাবন্ড বিল।

মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, দেশের জন্য লড়াই করার সুযোগ সবার ভাগ্যে জোটে না। যাঁদের ভাগ্যে জোটে তাঁরা হলেন ক্ষণজন্মা লড়াকু। বলেন বাংলাদেশ পুলিশের উর্ধ্বতন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

সর্বশেষ